ডা. আমিনুল ইসলাম

ডা. আমিনুল ইসলাম

এফসিপিএস (মেডিসিন) 
এমডি (বক্ষব্যাধি)
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় 


০৭ ডিসেম্বর, ২০২০ ০৯:৩৫ এএম

প্রেসক্রিপশনে জেনেরিকের বদলে ওষুধের ট্রেড নামোল্লেখ জরুরি কেন?

প্রেসক্রিপশনে জেনেরিকের বদলে ওষুধের ট্রেড নামোল্লেখ জরুরি কেন?

আগে শুক্রবারে যখন দূরের চেম্বারে যেতাম সচেতন রোগীরা প্রায়ই এক সপ্তাহ পর পরের শুক্রবারে ওষুধের খোসা  নিয়ে ফিরে এসে বলতো, আপনি কি লিখলেন আর ওরা কি দিল? আমাকেও ওষুধ বিক্রেতাকে ডেকে এনে জিজ্ঞেস করতে হতো সে কেন আমি যা লিখেছিলাম তা না দিয়ে অখ্যাত কোম্পানির ট্যাবলেট দিয়ে দিয়েছে।

জনাব মশিউল আলম একবার লিখেছিলেন, ‘জিজ্ঞাসা চিকিৎসক বন্ধুদের কাছে: আমরা যদি এমন একটা আইন চাই যে রোগীর ব্যবস্থাপত্রে ওষুধের ব্র্যান্ড নাম লেখা চলবে না, অবশ্যই জেনেরিক নাম লিখতে হবে, তাহলে কি আপনার আপত্তি থাকবে?’

আমার জবাব হলো, হ্যা, আপত্তি থাকবে। শুধু আপত্তি নয় ঘোরতর আপত্তি থাকবে। বাংলাদেশের বাস্তবতায়  জেনেরিক নাম লেখার পরিণাম হবে ভয়াবহ। আমি ভালো ব্র্যান্ডের ওষুধ লিখলেও দোকানদার চরম বাজে ওষুধ দিয়ে দেয়, আর জেনেরিক লিখলে তো তাদের পোয়াবারো। 

এদেশে অনেকগুলো ওষুধ কোম্পানি আছে যাদের কার্যক্রম ওষুধ বিক্রি, বিপণন ও মার্কেটিং শুধু গ্রামাঞ্চলের হাতুড়ে ডাক্তার, পল্লী চিকিৎসক এবং ওষুধের দোকানগুলো ঘিরে। আমরা কেউ ওইসব কোম্পানির বা তাদের ওষুধসমূহের নামও জানি না। ওদের বিজনেসটা মূলত: কোয়াক ও ডিসপেনসারি নির্ভর।

ভালো কোম্পানির কোনো এন্টিবায়োটিক যদি ২৫ টাকায় কিনে ৩০ টাকায় বিক্রি করে পাঁচ টাকা লাভ করে তবে ওই আটাময়দা সুজি দিয়ে তৈরি অখ্যাত কোম্পানির ওষুধ পাঁচ টাকায় কিনে ৩০ টাকায় বিক্রি করে লাভ করতে পারে ২৫ টাকা। রোগীর উপর এর প্রভাব অত্যন্ত নেতিবাচক। ওষুধ ক্রয়ের পেছনে পুরো পয়সা ব্যয় করেও রোগীরা কোয়াক ও ওষুধ বিক্রেতাদের লোভের বলি হয়।

মাঝে মাঝে রোগীরা এমন সব ওষুধের খোসা নিয়ে আসে যার ও তার প্রস্তুতকারী কোম্পানির নাম জীবনেও শুনিনি। টাইফয়েডের রোগী, প্রেসকিপশনে ভালো কোম্পানির ওষুধ লেখা অথচ তাকে সেটা না দিয়ে বিক্রেতা অধিক লাভের জন্য কোনো এক পচা কোম্পানির পচা ঔষধ গছিয়ে দেয়। ফল হয় মর্মান্তিক এমনকি মৃত্যুও।

বিষয়টি পরিষ্কার করতে জেনেরিক ও ট্রেড নাম নিয়ে একটা উদাহরণ দেই। Paracetamol হলো জ্বর ও ব্যথা নিবারণের ওষুধ। অর্থ্যাৎ ট্যাবলেটের ভিতর যে মূল উপাদান থাকে এর নাম Paracetamol। এই paracetamol কে দিয়ে তৈরি ওষুধকে এক কোম্পানি নাম দিয়েছে নাপা, অন্য কোম্পানি নাম দিয়েছে এইস। গাওগেরামের কোম্পানি Alkad নাম দিয়েছে Alkaparol, Pharmik কোম্পানি এর নাম দিয়েছে Anapol, Cosmo pharmaয় এর নাম Cpmol ইত্যাদি। এখানে Napa, ACE, Alkaparol, Anapol, Cpmol এসব কোম্পানিগুলোর দেওয়া Paracetamol এর trade বা বাজারী নাম। আর এ সবগুলোর ভিতরেই যেহেতু Paracetamol থাকে- Paracetamol এখানে generic বা মুল নাম। এখন আমি জেনেরিক নেম প্যারাসিটামল লিখতে বাধ্য হলে ওষুধ বিক্রেতা তাকে নাপা দিলেও সই, অখ্যাত ফার্মিক কোম্পানির Anapol দিলেও সই, যে কোম্পানি বা ওষুধের নাম ডাক্তার বা অন্যরা জীবনেও শোনেননি বা দেখেননি। 

লক্ষ্যণীয় যে, এই অখ্যাত কোম্পানি কিন্তু ওষুধ প্রশাসনের লাইসেন্সপ্রাপ্ত। ঠিক এই  জায়গাটাতে ঔষধ প্রশাসন কর্তৃক মান নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা থাকলে তখন আর জেনেরিক নাম-ট্রেড নাম নিয়ে চিকিৎসকদের কোন মাথাব্যথা থাকার কথা ছিল না। আমি লিখব ওষুধ রোগী পাবে আটা ময়দায় তৈরি পুরিন্দা-এটা কি ডাক্তার ও রোগী উভয়ের প্রতি অজ্ঞতাপ্রসূত অবিচার হলো না?

ধরুন, আমি prescription এ Napa বা ACE লিখতে পারবো না, Paracetamol লিখতে বাধ্য। তাহলে হবে কি লোভী ওষুধ বিক্রেতা আপনাকে ময়দা কোম্পানির Alkaparol, Cpmol ইত্যাদি গছিয়ে দিলেও তাকে চার্জ করার কোনো ground থাকবে না, কেননা সে তো paracetamol গ্রুপের ওষুধই দিয়েছে। আইনত: সে শতভাগ ঠিক। ওই কোম্পানিগুলোও যে ঘুষপাতি দিয়ে ম্যানেজ করে লাইসেন্স রেজিস্ট্রেশন ঠিকই বাগিয়ে নিয়েছে। এখন এ Cpmol খেয়ে কিডনি নষ্ট হয়ে গেলে দোষ হবে ডাক্তারের। 

উল্লেখ্য পচা কোম্পানির নানাবিধ ঔষধ খেয়ে গণহারে কিডনি নষ্টসহ অন্যন্য ট্রেজেডি বেশ কয়েকবার ঘটেছে। নিকট অতীতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রিড কোম্পানির কথা অনেকের মনে থাকতে পারে, যাদের প্যারাসিটামল খেয়ে অনেক শিশুর কিডনি নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। এই ট্রেজেডির আগে কয়জন চিকিৎসক জানতো এই কোম্পানির নাম? 

আমি আর জীবন রক্ষাকারী এন্টিবায়োটিক লিখতে গিয়ে Cefrtron বা  Arixon লিখতে পারবো না, লিখতে হবে generic নাম ceftriaxone। ওষুধবিক্রেতা দিয়ে দিবে অখ্যাত Astra কোম্পানির Cefaz। আর এই ঔষধে infection নিধন হবে সে আশা করাটা এক হাস্যকর ব্যাপার। রোগী মানহীন ঔষধ খেয়ে মারা যাবে, দোষ হবে ডাক্তারের। আমার সদিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও রোগীর জন্য আর ভাল কোম্পানির ওষুধ choice এর ক্ষমতা থাকবে না। ডাক্তার আর রোগী উভয়ের ভাগ্য নির্ভর করবে কোয়াক আর ওষুধ বিক্রেতার উপর। 

ডাক্তারের তবু দায়বদ্ধতা আছে এই ওষুধ খেয়ে তার জ্বর না কমলে বা সংক্রমণে মারা গেলে চাপটা আবার তার কাছে ফিরে আসবে। কেননা রোগী গিয়ে ওষুধ বিক্রেতার কাছে কখনোই অভিযোগ করবে না কি ভাই কি ওষুধ দিলেন ব্যথা তো কমলো না, রোগী তো মরে গেল। তাদের সমস্ত অভিযোগ থাকবে প্রেসক্রিপশন লেখক চিকিৎসকের উপরেই। 

আনাচে-কানাচে গজিয়ে ওঠা ওষুধ কোম্পানিগুলোকে লাইসেন্স দেওয়ার আগে তার মান নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করাটা তাই এই মুহূর্তের প্রধান কর্তব্য। তার আগে জেনেরিক নাম, ব্র্যান্ড নাম ধোয়া তোলাটা হবে নিতান্তই আত্মঘাতী।

আমরা এমন অনেক কোম্পানি ও ওষুধের নামও জানি না যেগুলো পল্লী চিকিৎসক ও ওষুধ বিক্রেতাদের হাত ধরে শুধু টিকেই নেই, দুর্দান্ত ব্যবসা করেও চলছে।

সততা ও কঠোর মান নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির ওষুধের মধ্যকার কোয়ালিটি কাছাকাছি আনার ব্যবস্থা করুন। কথা দিচ্ছি, জেনেরিক নাম লেখার প্রস্তাবনার প্রথম সমর্থনকারীটি হবো আমি।

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  ঘটনা প্রবাহ : ওষুধ
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত